প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
শুধু সিভি জমা দিয়েই ইসলামী বাংকে চাকুরী নিয়েছেন পটিয়ার অবৈধ হাজারো কর্মী.তাদের পেছনে খরচ ২৮০০ কোটি টাকা
বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ‘অবৈধভাবে’ নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের পেছনে বছরে প্রতিষ্ঠানটির খরচ হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
এই হিসাবে ২০১৭ সালে ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ‘অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত’দের বেতন-ভাতায় খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের দেওয়া বেতন-ভাতা আইনি দৃষ্টিতে বৈধ নয়। তাই এসব অর্থ ফেরত পেতে ব্যাংকের আদালতে যাওয়া উচিত। ‘অবৈধভাবে’ চাকরিতে ঢোকা এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ২০০ জনকে গত দুদিনে ছাঁটাই করেছে ইসলামী ব্যাংক।
পাশাপাশি ৪ হাজার ৭৭১ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণাধীন (ওএসডি) করা হয়েছে। ওএসডি হওয়া মানে তাদের বেতন-ভাতা অব্যাহত থাকবে, তবে কোনো কাজ বা দায়িত্ব থাকবে না।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ‘অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত’ এই কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা এবং এস আলম গ্রুপের প্রভাবের সময় পরীক্ষা না দিয়ে শুধু সিভি জমা দিয়ে তারা চাকরিতে ঢুকেছিলেন। ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার। এর অর্ধেকের বেশি কর্মী চট্টগ্রাম অঞ্চলের।
অথচ ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে ব্যাংকের মোট কর্মী ছিলেন ১০ হাজার। এরপর থেকেই যোগ্যতা বিবেচনা না করে অযোগ্যদের চাকরিতে নেওয়া শুরু হয়, যা ব্যাংকের আর্থিক সংকট ও সুনামহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে নতুন পর্ষদ নিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নিয়েই প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর মান বা যোগ্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। সিনিয়র অফিসার থেকে শুরু করে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ পরীক্ষার আওতায় আনা হয়। জানা গেছে, ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ গত ১৪ আগস্ট পরীক্ষার তারিখ ২৯ আগস্ট নির্ধারণ করেছিল।
পরে ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার মো. হানিফ ২৭ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করলে আদালত বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ পর্যালোচনা করে ২৫ সেপ্টেম্বর জানায়, ইসলামী ব্যাংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই কর্মীদের চাকরি, নিয়োগ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া তাদের নিজস্ব এখতিয়ারে। তবে সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের মধ্যে হতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা গ্রহণ করে, যা শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ৫ হাজার ৩৮৫ কর্মীর অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৪১৪ জন অংশ নেন এবং তারা নিয়মিত অফিসও করেছেন। তবে বাকি ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষা এড়িয়ে পরদিন অফিসে হাজির হন। এদের মধ্যে ২০০ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বাকি ৪ হাজার ৭৭১ জনকে তাদের কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। পরীক্ষা আয়োজনের আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক থেকে একটি নোটিশ জারি করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক বলে জানানো হয়।
তবে পরীক্ষার দিন বহু কর্মী পরীক্ষায় না বসে বর্জন কর্মসূচি পালন করেন। তারা সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে পরীক্ষার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হয়নি দাবি করে তারা বলছেন, হাইকোর্ট নিয়মিত প্রোমোশনাল পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নতুন করে বিশেষ পরীক্ষা আয়োজন করেছে, যা আদালতের আদেশের পরিপন্থি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কর্মীদের মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া বাংলাদেশে নতুন অভিজ্ঞতা।
এর আগে ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে এভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। সাধারণত পদোন্নতির জন্যই ভাইভা বা লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংককে এখন দুই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—প্রথমত, তারা কেন পরীক্ষাহীনভাবে হাজারো কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল এবং দ্বিতীয়ত, কেন এখন ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা নিচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, যদি ব্যাংকের নীতিমালায় পরীক্ষা নেওয়ার বিধান থাকে, তবে তারা তা করতে পারবে। ফলে বিষয়টি এখন আদালত ও ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কর্মীদের ছাঁটাই ও কাজ থেকে বিরত রাখা প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যারা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি তাদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত উগ্র আচরণ করা ২০০ জনকে গত দুদিনে ছাঁটাই করা হয়েছে।
বাকিদের আপাতত ওএসডি করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া কর্মকর্তাদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক তাদের ওপর পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছে। মোহাম্মদ ইস্কান্দার সুজন, এস এম এমদাদ হোসাইন, মোহাম্মদ ইকবাল, দিলরুবা আক্তার, শারমিন আক্তার ও নাসরিন জান্নাত নামে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। এ কারণে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
সম্পাদক : মোহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দিক, নির্বাহী সম্পাদক : নূর হাসান আকাশ , বার্তা সম্পাদক : মেহেদী হাসান তালুকদার , প্রকাশক : মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম .. বার্তা বাণিজ্য কার্যালয় : ২১৭ ফকিরাপুল প্রথম লেন,আরামবাগ,মতিঝিল । ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: +8801744552281 ইমেইল : newspriyotimes@gmail.com