প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬
খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর কোন পথে যাবে ইরান, ভবিষ্যৎ কী
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটি এখন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক মুহূর্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হওয়া, প্রতিশোধের ঘোষণা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিস্থিতিতে ইরান কোন পথে এগোবে।
সংঘাত আরও তীব্র হবে, নাকি রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও নতুন কৌশলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে তেহরান—তা নিয়েই চলছে ব্যাপক আলোচনা। জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, তেহরানে খামেনির বাসভবন কমপ্লেক্সে একাধিক বোমা হামলার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। ‘
বেইত-এ রাহবারি’ নামে পরিচিত এই কমপ্লেক্সটি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি অতীতে বিভিন্ন বক্তৃতায় শহীদ হওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছিলেন।
হামলার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি শেষ কয়েক দিন পরিবারসহ ওই বাসভবনেই অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক ও উল্লাস—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় দেশটির সাধারণ মানুষ কতটা এসব ভিডিও দেখতে পারছেন, তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমর্থকদের শোকসভা সম্প্রচার করা হচ্ছে। সরকারিভাবে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং এক সপ্তাহের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের কয়েকজনও নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুলরহিম মুসাভি।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি জানিয়েছেন, ক্ষমতা হস্তান্তর তদারকির জন্য একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চায় না, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, খামেনির দেখানো পথেই তারা এগিয়ে যাবে। সংগঠনটি দাবি করেছে, অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ফারজান সাবেত মনে করেন, খামেনির মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই।
তার মতে, কোনো রাষ্ট্রের একজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হলেও পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা সাধারণত কম থাকে। Geneva Graduate Institute–এর গ্লোবাল গভর্ন্যান্স সেন্টারের এই গবেষক বলেন, সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য ইরান দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং আগের সংঘাতগুলো থেকে তাদের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াও বিভিন্ন সামরিক ইউনিট পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিও বেড়েছে। ইরান আগেই জানিয়েছিল, সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। ইতোমধ্যে তারা কাতার ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি ছাড়াও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনা এবং দুবাইয়ের মতো জনবহুল শহরে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
University of South Florida–এর মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক আরমান মাহমুদিয়ান বলেন, ইরানের পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক শক্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবে যুদ্ধের ব্যয় বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা তেহরানের অন্যতম কৌশল হতে পারে।
অন্যদিকে University of Sussex–এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক সারা কারমানিয়ান মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা কিংবা ইরাকের হাশদ আল-শাবি ও ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করা—এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো ইরানের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। তবুও দেশটি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই করছে। কারমানিয়ানের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কঠোর হওয়ায় মানবিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ চাপ তুলনামূলক কম থাকে। তাই সংঘাতের মধ্যেও টিকে থাকা তেহরানের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান যদি আরও বড় হামলার পথে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও নজিরবিহীন শক্তি প্রয়োগ করবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়বে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রভাবশালী মহলের মধ্যে আলোচনার পথ খুলবে। আপাতত সেই উত্তর এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
সম্পাদক : মোহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দিক, নির্বাহী সম্পাদক : নূর হাসান আকাশ , বার্তা সম্পাদক : মেহেদী হাসান তালুকদার , প্রকাশক : মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম .. বার্তা বাণিজ্য কার্যালয় : ২১৭ ফকিরাপুল প্রথম লেন,আরামবাগ,মতিঝিল । ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: +8801744552281 ইমেইল : newspriyotimes@gmail.com